মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল, ২০১৩


                      অদ্ভুত সেই লোকটি                                   

১৯৮৮-৮৯ সালের ঘটনা ।বাবা তখন মুম্বাই থেকে লনাভালা বদলি হলেন ।মুম্বাই থেকে মোটামুটি ১২০কিমি দূরের পাহাড়ি একটা স্টেশন এই লনাভালা ।তখন আমি পড়ি ক্লাস নাইনে ।গ্রীষ্মের ছুটিতে মা বড় ভাই আর আমি বাবার কাছে চলে যেতাম ।আমার চাচতো ভাই পরাগ যে আমার থেকে কয়েক বছরের বড় থাকত লনা ভালাতেই ।সেখানে গেলেই তাই একসঙ্গে প্রচুর ঘোরাফেরা আর আড্ডাবাজি হত ।তবে আমাদের অবসর বিনোদনের সবচেয়ে পছন্দের জায়গা ছিল কাছের একটা পাহাড় ।একটা স্কুলের পাশেই ছিল ওটা ।সাইকেলে চেপে ফ্লাক্স ভর্তি কফি নিয়ে চলে যেতাম পাহাড়টায় ।পরাগের দুজন বন্ধুও সাধারনত সাইকেল নিয়ে আসত আমাদের সঙ্গ দিতে ।একরাতের ঘটনা
প্রিয় জায়গাটায় বসে কফি পান আর নানান আলাপে মশগুল আমরা ।এসময় একজন মানুষকে আসতে দেখলাম এদিকে ।কাছাকাছি হতেই দেখলাম রোগা,বুড়ো একজন মানুষ ।এতরাতে এমন একজন লোককে এখানে দেখে অবাক হলাম সবাই ।
কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম তিনি এখানে কি করছেন আর তার কোন সাহায্য লাগবে কিনা ।বুড়ো জানালেন কাছের একটা গ্রামে থাকেন ।আর মুম্বাইয়ের দিকে যাওয়া রাতের শেষ ট্রেনটা ধরবেন ।মুম্বাইয়ে ছেলের কাছে যাবেন ।লোকটার দূর্বল শরীর দেখে এমনিতেই মায়া হচ্ছে ।তারপর আবার মনে হলো হেঁটে গেলে নির্ঘাত ট্রেনটা মিস করবেন ।আর এসময় এদিক থেকে রেলস্টেশনে পৌছনোর কোন যান পাওয়ারও সুযোগ নেই ।কাজেই পরাগ তাকে তার বাইসাইকেলে করে স্টেশনে পৌছে দিতে চাইল ।পরাগের বন্ধুর সাইকেলে চেপে আমি আর আমার ভাইও ওদের সঙ্গী হলাম ।তাকে স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে এসে আবারও গল্পে মেতে উঠলাম ।তারপরই যেটা ঘটল এটা মনে করে আজো শরীরে কাঁটা দিয়ে ওঠে আমার ।লোকটাকে নামিয়ে দিয়ে আসার পর আধঘন্টাও পার হয়নি ।সবারই ঘুম ঘুম আসছে ।বাসায় ফিরে যাওয়ার কথা ভাবতে শুরু করলাম ।এসময়ই অন্ধকারে একটা কাঠামোকে আসতে দেখলাম,একটু আগের লোকটা যেদিক থেকে এসেছেন সেদিক থেকেই ।তারপরই অবাক বিস্ময়ে আবিষ্কার করলাম সেই পলকা দেহের বুড়ো লোকটাই এগিয়ে এল আমাদের দিকে,যাকে অল্প আগে স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে এসেছি ।বুড়ো কাছে এসে স্টেশনে পৌছে দেওয়ার অনুরোধ করলেন ।
আমরা সবাই বড় রকমের একটা ধাক্কা খেয়েছি ।মনে হলো যেন একটা ঘোরের মধ্যে আছি ।নড়তে পর্যন্ত পারছিনা ।মাত্র আধ ঘন্টার মধ্যে লোকটার পক্ষে কোনমতেই হেঁটে এখানে আসা সম্ভব নয় ।আর তিনি ফিরে এসে আবার স্টেশনেই বা যেতে চাইবেন কেন?
মনে মনে প্রার্থনা করতে শুরু করলাম ।আর এর জোরেই হোক কিংবা অন্য কোন কারনে হঠাত্‍ করেই যেন ঘোর কেটে গেল আমার ।ধাক্কা দিয়ে অন্যদেরও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনলাম ।তারপর সাইকেলে উঠে দ্রুত এই জায়গা ছাড়লাম ।একবার ও পিছু ফিরে তাকাবার সাহস করলাম না ।রাতে আমাদের একজনেরও ঘুম হলো না ।কয়েকদিন পর স্থানীয় লোকদের সেই বুড়ো লোকটার কথা জিজ্ঞেস করলাম ।কিন্তু কেউই তাঁর ব্যাপারে কিছু বলতে পারলোনা ।এমনকি বুড়ো লোকটাকে দেখেছে এমন মানুষও পাওয়া গেলনা ।তবে রাতে ওই পাহাড়ের কাছে না ঘেঁষার পরামর্শ দেওয়া হলো ।
এরপরও আরো অনেকবার লনাভালা গিয়েছি ।কিন্তু কখনো আমাদের পুরানো আড্ডার জায়গাটায় যাওয়ার সাহস করিনি

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন