যোগসূত্র
আমার দাদার বাড়ি মুনশিগঞ্জ জেলায় । দাদারা চার ভাই। কোন বোন নেই। যদিও দাদার মা তিন মেয়ে সন্তান জন্ম দেন, কিন্তু কোন এক অজানা কারণে তার কোন মেয়েই জন্মের পর বেশিদিন বাঁচত না ।তারা মারা যেতো বিভিন্ন দুর্ঘটনায়। এবং সেই সব দুর্ঘটনার কথা শুনলে আসলেই মনে হয় এদের মৃত্যুর পিছনে অন্য কোন অশুভ শক্তির হাত আছে। আমি বড় হয়ে দাদা ভাইয়ের কাছে এই ঘটনাগুলো শুনেছিলাম। যেভাবে শুনেছি ঠিক সেভাবেই বলছি।প্রথমে দাদা ভাইয়ের যে বোন হয় অর্থাৎ বড় মায়ের প্রথম সন্তান তার জন্মের ঠিক ৩ মাস পরের ঘটনা। ঘরে শুধু দাদা ভাইয়ের আম্মু আর উনাদের এক কাজের মেয়ে। কাজের মেয়ে বড় মা(দাদা ভাইয়ের আম্মু)কে সাহায্য করছিল রান্নার কাজে। বড় মা রান্না শেষে ঘরে গিয়ে দেখেন তার মেয়েটা নেই। তিনি চিৎকার করে উঠেন এবং দরজা খুলে বের হন। বের হয়ে বাড়ির বাকি সবাইকে ডেকে একত্রে করেন ।সবাই ঘরের আঁতিপাঁতি করে খুঁজেও কোথাও মেয়েটিকে পায় না। অবশেষে পুকুরপাড় থেকে পানিতে ভাসমান অবস্থায় তাকে পাওয়া যায়। পানিতে ডুবে মৃত্যু এমনটাই ছিল কারণ। কিন্তু ৩ মাসের একটি বাচ্চা কিভাবে এতদুর গেলো? ঘরের দরজা লাগানো ছিল এবং ঘরে শুধু দুজন মানুষ ছিল। মাত্র ১০ মিনিট রান্নাঘরে ছিলেন তারা ।তাতেই এতকিছু ঘটে গেলো।
বড় মার দ্বিতীয় মেয়েটি হয় তিন নম্বরে ।অর্থাৎ এর মাঝে দাদা ভাই এবং উনার এক ভাই হয়েছেন। সেই মেয়েটি কিছুদিন বেঁচে ছিলো। বয়স যখন ১ বছর তখন বড় মা মেয়েকে নিয়ে উঠোনে বসে ছিলেন । উনি সুপারি কাটছেন আর পাশে বসে তার মেয়ে একটিপুতুল দিয়ে খেলছে। বড় মা সুপারি কাটতে কাটতে হটাত খেয়াল করলেন তার মেয়ে তার পাশে নেই। তিনি যেখানে বসে ছিলেন সেখান থেকে পুরো উঠোন দেখা যায়। এভাবে গায়েব হয়ে যাবার প্রশ্নই উঠে না। সেই মেয়ের কোন ঠিকানাই পাওয়া গেলো না। বড় মা প্রায় মৃত্যুর দশায় চলে গেলেন। কিছুদিন পর খড়ের গাদা (যেখানে গরুর খড় জমা করে টালি দিয়ে রাখা হয়) থেকে কেমন বিচ্ছ্রি গন্ধ বের হতে লাগলো। মানুষজন কৌতূহলী হয়ে খড়ের গাদা সরালে সেখান থেকে বড় মার দ্বিতীয় মেয়ের লাশ পাওয়া যায়।
বড় মার তৃতীয় মেয়েটি ছিল সবার ছোট। এই মেয়েটি বেঁচে ছিলো অনেকদিন। তাকে সারাদিন অনেক চোখেচোখে রাখা হত।একা কোথাও যেতে দেয়া হতো না। কেউ না কেউ আঠার মতো লেগে থাকতো। সেই মেয়ে একদিন ঘরের মধ্যে আত্মহত্যা করে মারা যায়। ফ্যানের সাথে ফাঁস লটকে। ঘরের দরজা ভেতর থেকে লাগানো ছিল। রাতে খাবারের সময় ডাক দিলে পাওয়া না গেলে সবাই মিলে দরজা ভেঙে ফেলে এবং সেখান থেকে বেরকরে ঝুলন্ত লাশ।
আমি জানি না আমার বড়মা কিভাবে এসব সহ্য করেছিলেন। উনাকে এই ব্যপারে কখনো কথা বলতে দেখি নি কেউ। উনি নাকি খুব স্থির হয়ে গিয়েছিলেন। কারো সাথেই কথা বলতেন না একদম। আমি নিজেও একজন মেয়ে। মনে হয় না আমার সাথে এমনটা ঘটলে কখনো মেনে নিতে পারতাম। আল্লাহ আমার বড় মাকে অনেক কষ্ট দিয়েছেন। জানি না কি তার কারণ।
দাদা ভাইয়ের কাছ থেকে এসব শোনার পর অনেক ভেবেছি। কিন্তু কিছু বুঝে পাই নি। একই পরিবারে এতো মানুষ কিভাবে এমন ভাবে মারা যেতে পারে?
লেখক
আফরোজা সুলতানা নিধি
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন