মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল, ২০১৩

   

                       পুর্ণিমা রাতের ভূত

রোড এক্সিডেন্টে নানী মারা যাবার পরে নানাকে আবার বিয়ে দেওয়া হয় ।নতুন নানী খুবই ভালো মানুষ,তেমনই তার পরিবারের মানুষেরা ।নতুন নানীর বাপের বাড়ি ফরিদপুরের তাম্বুলখানা গ্রামে ।এই গ্রামের যে বড় বিলটি আছে তার মাঝখানে ছোট ছোট দ্বীপের মত আট-দশটা করে বাড়ি ।যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম ছোট নৌকা ।প্রায় সব পরিবারেই একটা করে নৌকা আছে ।ইলেকট্রিসিটি পৌছানোর প্রশ্নই ওঠেনা ।আমরা একবার খুব আয়োজন করে সেখানে বেড়াতে গেলাম ।ফরিদপুরের মানুষের রান্নার হাত খুবই ভালো ।দুপুরে আয়েশ করে একটা ঘুম দিয়ে বিকেলে উঠলাম ।এরপর নৌকো নিয়ে বিলে শাপলা তুলে বেড়ালাম ।সন্ধারপরে দেখি নানীর ছোট ভাই,জাহিদ ভাই নৌকা নিয়ে মাছ মারতে চলেছেন ।আমিও যাব সিদ্ধান্ত হলো ।আমরা তিনজন, আমি,জাহিদ ভাই ও তার বন্ধু মেহেদি ভাই ।সরন্জাম নেয়া হলো জাল, কোঁচ, হারিকেন এবং পর্যাপ্ত পরিমানে সিগারেট ।আমিও তখন সিগারেট খাওয়া শিখে গেছি ।খুব রোমান্ঞ্চ হচ্ছিলো ।
অর্ধেক চাঁদ আছে আকাশে,আমি নৌকোর মাঝখানে বাবু হয়ে বসে আকাশ দেখছি,আর সিগারেট টানছি ।অপুর্ব লাগছে প্রকৃতি!! অর্ধেক চাঁদও শহরের পুর্ণিমাকে হার মানায় ।তামাক পর্বে আমাকে ডাকা হলোনা ।কিছুটা মন খারাপ হলো ।এরপর শুরু হলো মাছ ধরা ।আমি বসে আছি চালক মেহেদি ভাইয়ের কাছাকাছি ।জাহিদ ভাই জাল মারছেন ।মাছ খারাপ উঠছেনা ।একটু দুরে বেশি মাছ পাওয়ার আশায় আমরা এগিয়ে চললাম ।যতই এগুই ততই মাছের পরিমান বেড়ে যায় ।আস্তে আস্তে লোকালয় থেকে বেশ দুরে চলে এলাম ।প্রচুর মাছ উঠছে ।মাছ গুলো নৌকার খোড়লে জমা করা হচ্ছে ।আমি নিষ্ক্রিয় বসে আছি ।হঠাত ঠান্ডা বাতাস উঠলো, গা হীম করা অনুভুতি ।এর পরেই হঠাত নৌকার চারপাশ থেকে কেমন মুট-মুট শব্দ হতে শুরু করলো ।ব্যাপারটা নিয়ে জাহিদ ভাইদের কোন উদ্বেগ দেখলাম না ।একমনে মাছ ধরছেন ।কিন্তু শব্দটা ক্রমেই অসহ্য উঠছে ।আমি একবার বলেই ফেললাম "ভাই, কেমন একটা কুট-মুট শব্দ পাচ্ছি।"
জাহিদ ভাই অভয় দিয়ে বললেন "নৌকার খোলে মাছ লাফানোর জন্য এমন শব্দ"
আমি ভাবলাম "তাই হবে"!!! তবে একটু ভয় ভয় হটতে লাগলো ।হারিকেনটা একটু উস্কে দিলাম ।জাহিদ ভাই বেশ কিছু মাছ তুলে মেহেদি ভাইকে বললেন " এবার তুই"।
বলে হারিকেন নিয়ে খোড়লের মাছ দেখতে গেলেন,এবং চিতকার করে লাফিয়ে সরে গেলেন ।আমি লাফ দিয়ে উঠে সরতে সরতে বললাম "ভাই কি হয়েছে"।
তিনি কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন"পেত্নি, মাছ খাচ্ছে!!"
আমি একটু উকি দিয়ে তাকালাম খোড়লের ভেতর ।যা দেখলাম তাতে গা শিউড়ে উঠলো ।একটি মাছেরও শরির নেই, শুধু অসংখ্য মাথা পড়ে আছে, আর রক্ত মেশানো পানি!!
মেহেদি ভাই বললেন "এখান থেকে সরে যেতে হবে!"
প্রানপনে দাঁড় টানা শুরু হলো, এবার শব্দটা কুট-কুট থেকে অনেক বেড়ে গিয়ে মট-মটের মত লাগছে ।
জাহিদ ভাই চিতকার করে বললেন "ওরা নৌকা ভাঙতে চাইছে...." বলেই আরও জোরে দাড় বাইতে থাকলেন,কিন্তু অদ্ভুত কারনে আমরা খুব একটা এগুতে পারছিনা ।আমার মনে ঝড় বইছে!এটা কিভাবে সম্ভব??
প্রানান্তকর চেষ্টা চলছে বাড়িতে পৌছানোর,শব্দ বেড়েই চলেছে। আমি দুজনের গা ঘেষে বসে আছি ।ভয়াবহ ভয় জড়িয়ে ফেলেছিলো আমাকে।
যাহোক শেষ মেশ জাহিদ ভাইদের বাড়ির দ্বীপমতো জায়গাটায় পৌছতে পারলাম ।নৌকো পাড়ে ঠেকতেই ঝপঝপ করে লাফিয়ে নামলাম ।নৌকাটা কোন রকম বেধে রেখেই দে দৌড়! এক দৌড়ে বাসা ।
জাহিদ ভাইয়ের চিল্লাচিল্লিতে সবাই উঠে এল ।কাহিনি শুনে সবাই হতবাক ।
পরে শুনেছিলাম ।বিল এলাকায় মাছ ধরতে গিয়ে অনেকেই এই বিপদে পড়েছেন ।অনেকের নৌকা উল্টে দেয়া হয়েছে ।কে এমন করে মাছ খায়? ওরা কারা, যাদের বলা হয় মাছ খেকো পেত্নী?
কে উল্টে দেয় নৌকা? কে? কোথায় ওরা থাকে?
আপনাদের কি মনে হয়?


লেখক 
ইউনুস খান

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন